সাফল্য কামনায় গুণি লেখকের ভাবনা

লালন শিল্প চর্চা ও গবেষণা ফাউন্ডেশনের অগ্রযাত্রা উত্তোরত্তোর সাফল্য কামনায় দুইজন গুণি লেখকের মূল ভাবনা।

লালনের গানে ভাব-ঐশ্বর্য
প্রফেসর ড. আনোয়ারুল করীম

কুষ্টিয়া অঞ্চলের লোকসঙ্গীত মূলতঃ পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের লোকসঙ্গীত। পশ্চিমাঞ্চলের লোকসঙ্গীত বলতে বাউল এবং বৈষ্ণবীয় পদাবলী। উভয় লোকসঙ্গীত প্রেম ও দেহতত্ত¡ বিষয়ক। প্রেমভিত্তিক লোকসঙ্গীতে বিরহ এবং মিলনের প্রতি নিদারুণ আর্তি। বৈষ্ণবীয় এবং কীর্তনজাতীয় লোকসঙ্গীতে কৃষ্ণের প্রতি রাধার প্রেম কখনো দেহবাদ, কখনো দেহাতীত জীবনের প্রতি নিবদ্ধ। কৃষ্ণের প্রতি রাধার প্রেম সমাজ ও সকল সংস্কারের ঊর্ধ্বে। পুরোটাই পরকীয়া ভাবনাজাত। বাউল সঙ্গীত মূলতঃ সুফী সঙ্গীত। ইরানে সুফী সঙ্গীতের প্রধান নাম ‘সামা’। বাউল সঙ্গীতের আদি উৎপত্তিস্থল ইরান বা পারস্য। এখানেই বা’আল সুফীগোষ্ঠীর উদ্ভব যা বাংলাদেশে বাউল’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জোলেখা’ এবং দৌলত খান উজির বাহরাম খান বিরচিত “লাইল-মজনু’ এ দু’টি কাব্যগ্রন্থে বাউল’, ‘বাউর’ ‘আউল’, শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। আরবী-ফারসীতে বা’আল>বাউল’ শব্দের অর্থ প্রেমে পাগল বা পাগলিনী। ড. মঈনের A Dictionarz of Persian Language-এ বা’আল’ শব্দকে One who is madlz in love অথবা One who is infatuated in love বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ড. মঈন বলেন :”Baal meaning one who frees himself from an obligation bz purgerz; infatuated or in love with. He was a wanderer in the desert.”

অন্যান্য আরবী-ফারসী গ্রন্থে বা’আল’ অর্থ-Husband, Consort বা প্রভু, স্বামী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাউল গানে এসব অর্থই নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ইউসুফ-জোলেখা কাব্যগ্রন্থে ইউসুফের প্রতি জোলেখার প্রেমকে বাউল বা পাগল প্রকৃতিসুলভ আচরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। লাইল-মজনু’ কাব্যগ্রন্থেও বাউল’, বাউরা’ শব্দের প্রয়োগ রয়েছে এবং এখানেও প্রেমে পাগলিনী বা পাগল স্বভাবকে ‘বাউল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ভারতবর্ষে মধ্যযুগীয় সাধক কবীর এই বাউল বা বাউর গানের প্রবর্তক। বাংলাদেশে দেহতত্ত¡ বিষয়ক শব্দ, ধুয়া এবং ভাবগান বেশ প্রসার লাভ করেছিল। লালন ফকিরের পূর্বে সিরাজ সাঁই এপার বাংলায় প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তবে তার নামে স্বতন্ত্র কোন গান পাওয়া যায় না। তবে লালন ফকিরের প্রায় গানে গুরু হিসেবে তাঁর নাম ব্যবহৃত হয়েছে। হেরাজতুল্লা বলে অপর একজন বাউল সঙ্গীত রচয়িতার নাম পাওয়া যায়। লালন ফকিরের সমসাময়িকদের মধ্যে ইদু বিশ্বাস, পাগলা কানাই, পাঞ্জু শাহ, গগন হরকরা, ফিকির চাদ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। লালনের পূর্বে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর (মৃত্যু ১৭৬০ খ্রিঃ) দেহতত্ত¡মূলক গান রচনা করেন। বিহারীলাল বাউল বিংশতি’ নামেও একটি সঙ্গীতগ্রন্থ রচনা করেন। মীর মশাররফ হােসেন বিরচিত বেশ কিছু বাউল গান রয়েছে।

তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলা লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতের বিচারে বাউল ফকির লালন শাহ একজন যুগান্তকারী প্রতিভা এবং গীতি রচয়িতা ও সাধক। লালনের পূর্বে ভারতের পাঞ্জাবে বসবাসকারী একজন সুফী সাধক যার নাম মির্জা মুহসীন-ই-ফানি প্রায় তিনশ বছর আগে দাস্তান-ই-মাহজীব নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে বাউল সুফীদের জীবনাচরণ ও সাঅনুত্ত¡ সম্বন্ধে উল্লেখ রয়েছে। লালনের সমসাময়িক অথবা কিছু পূর্বে পশ্চিম বাংলার (ভারত) চব্বিশ পরগণা নিবাসী কাজী কারামত উল্লাহ মনোরঞ্জন উচিত কথা’ নামে একটি সাঅনুত্ত¡ বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করেন ১২৯৬ বঙ্গাব্দে। তিনি বাউল মতাবলম্বী ছিলেন এবং লালনের মতো একজন সাধনসঙ্গীত রচয়িতা ছিলেন। কাজী কারামত উল্লাহ তাঁর গ্রন্থে কয়েকজন সাধকের নাম ও তাদের কর্মকাÐের কথা উল্লেখ করেন। এদের একজনের নাম শাহ শের আলী, বাড়ী ২৪ পরগণা জেলা, পশ্চিম বাংলা (ভারত)। তিনি বাউলুল আরেফিন’, ‘রামযুল আরেফিন এবং ‘নাজাতুল শরা’ নামে তিনটি গ্রন্থ বাংলায় রচনা করেন। সবগুলো গ্রন্থই সুফী ফকিরদের সাঅনুত্ত¡ নিয়ে আলোচনা বিষয়ক। এসব গ্রন্থে আরব এবং পারস্যের সুফী ফকিরদের জীবনাচরণ ও কর্মকাÐের বিবরণ পাওয়া যায়।

এ গ্রন্থে সুফী ফকিরদের দেহতত্ত¡মূলক ধুয়া ও ফকিরী গান অন্তর্ভুক্ত আছে। কাজী কারামত উল্লাহ তাঁর গ্রন্থ মনোরঞ্জন উচিত কথা’য় বুধু শাহ’ নামে আরেকজন বাউল ফকিরের উল্লেখ করেছেন। তাঁর বাড়ীও পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগণায়। বুধু শাহ মাওলা-ই-মাওলা’, ‘জলসানামা’, দীদারে ইলাহী’ এবং ‘বিদারে আশেকীন’ নামে তিনটি সাধনভজনমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এসব গ্রন্থে সুফী সাধনার পাশাপাশি রাধাকৃষ্ণ এবং কৃষ্ণের ৯৬০০ গোপীদের কর্মকাÐের বিবরণ রয়েছে।
বাউল সাধনা ধর্মীয় সাধনা হিসেবে বেশ প্রাচীন এবং এর উৎপত্তিমূল কুষ্টিয়া অঞ্চলে নয়। সুফীদের মাধ্যমে এই সাধনা ভারত, পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশে প্রসার লাভ করেছে। তবে নদীয়ায় চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে এবং বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে পশ্চিম বাংলায় বাউল সাধনা বৈষ্ণবভাবাপন্ন। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান বিধায় ও সুফীদের আগমনে বাউল সাধনায় বৈষ্ণব অপেক্ষা সুফীচেতনা প্রাধান্য পেয়েছে। কুষ্টিয়া জেলায় লালন শাহের সমসাময়িক ছিলেন পাঞ্জু শাহ। তাঁর জন্ম ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুÐু থানার হরিশপুর গ্রামে। তবে পাঞ্জু শাহের তত্ত¡ সাধনানির্ভর; ভাষা সহজ সরল। লালনের গান এদিক থেকে ভাষা ও ভাব সমৃদ্ধ। বাউলদের ঘরানা আছে। এই ঘরানার সংখ্যা পাঁচ। লালনশাহী, পাঞ্জুশাহী, দেলবারশাহী, পাঁচুশাহী এবং উজ্জ্বলশাহী। মানিকগঞ্জের ঝিটকা নিবাসী দেওয়ান রশিদের একটি বিশেষ ঘরানা। এই ঘরানায় মারফতী ও মুর্শিদা গানের প্রাধান্য রয়েছে। মহিম শাহ এই ঘরানার অনুসারী। লালন শাহ নিজেই একটি ঘরানার জন্মদাতা। কিন্তু তিনি মূলত সিরাজ শাহের ঘরানার মানুষ।

বাউল গান মূলত বাংলাদেশের পশ্চিম অঞ্চলের সাধন-সঙ্গীত। কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলে এই গানের প্রাধান্য আছে। এতদাঞ্চলে বাউল গানকে ভাবগান বলা হয়। কোন কোন বাউল গানে কীর্তনের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। কুষ্টিয়া নদীয়ার সন্নিকটে বলেই অনেক গানে স্বাভাবিকভাবেই কীর্তনের ভাব এবং সুর সমন্বিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ যখন কুষ্টিয়া অঞ্চলে থেকেছেন তখন লালন ফকির ছিলেন এতদাঞ্চলে বাউল বা ভাবগানের একচ্ছত্র অধিপতি। তার পাশাপাশি পাগলা কানাইও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। পাগলা কানাইয়ের গান ছিল শব্দ এবং ধুয়া জাতীয়। রবীন্দ্রনাথ লালন ফকিরের গান শুনে মুগ্ধ হন। তিনি লক্ষ্য করেন, লালনের গানে যে, ভাব-ঐশ্বর্য তা অন্যদের মধ্যে নেই। এ গানে উপমা এবং প্রতীকের ব্যবহার অতুলনীয়। এ গান মূলতঃ সাধন-ভজনের গান হওয়াতে এবং সাধারণের নিকট এর অর্থ সহজবোধ্য না করার অভিপ্রায়ে নানা উপমা সৃষ্টি করা হয়েছে। দেহবাদী দর্শনকে আড়াল দিয়ে এ গানগুলোকে সাধারণের নিকট মাধুর্যমÐিত করার জন্য যে প্রতীকী ব্যবহার করা হয়েছে তা যেমন অসাধারণ রসমাধুর্যে সরস হয়েছে তেমনি দেহকেন্দ্রিক প্রতীকী এবং উপমার সাহায্যে দীক্ষিত বাউলের নিকট তা অর্থবহ করে তোলা হয়েছে। এই রূপকের ব্যবহার লালনের গানকে অসাধারণ শিল্প এবং ভাবসমৃদ্ধ করেছে। যেমন-

(১) লীলা দেখে লাগে ভয়
নৌকার উপর গঙ্গা বোঝায়
গঙ্গা ডাঙ্গা বয়ে যায়।।
(২) চাঁদে চাঁদ ঢাকা দেওয়া
চাঁদে দেয় চাঁদের খেওয়া
জমিনে ফলছে মেওয়া।
চাঁদের সুধা ঝরে। ।
(৩) আঁখির কোণে পাখির বাসা
দেখতে পারি কী তামাসা
আমার এই আদম দশা
কে আর ঘুচায়।।
(৪) বাড়ীর কাছে আরশীনগর
সেথা এক পড়শী বসত করে।

প্রতি গানেই এমন অসংখ্য উপমা এবং রূপকের ব্যবহার লালনের গানকে এক অপ‚র্ব শিল্পসুষমামÐিত করেছে। এমনি আরেকটি গান :
– কে কথা কয় রে দেখা দেয় না
নড়ে চড়ে হাতে কাছে
খুঁজলে জনম ভর মেলে না।।

William Wordsworth-এর’The Cuckoo’  কবিতার সঙ্গেই এর তুলনা দেওয়া চলে। রবীন্দ্রনাথ খুব ছেলেবেলায় দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কুষ্টিয়া এসেছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ১৫/১৬ বছর। সে সময় তিনি লালন এবং বাউলদের গান শুনেছিলেন। পরবর্তীকালে জমিদারীর দায়িত্ব নেবার আগেও তিনি আরো কয়েকবার বেড়াতে এসেছিলেন। এরপর তাঁর বয়স যখন ২২ বছর তখন তিনি তাঁদের পারিবারিক পত্রিকা ভারতী’তে ‘বাউলের গান’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধটি ছিল সঙ্গীত সগ্রহ ও বাউলের গাঁথা’ নামে একটি গ্রন্থের সমালোচনা। এখানে এই নিবন্ধের কিছু অংশের উল্লেখ করা হল। সেই তরুণ বয়স বাউলের গান যে তাঁর মন কেড়েছিল তার বেশ প্রমাণ রয়েছে তাঁর আলোচনায়। রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন :

“ইহাকে দেখিলেই এমন আত্মীয় বলিয়া মনে হয় যে, কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া ইহাকে প্রাণের অন্তঃপুরের মধ্যে প্রকাশ করিতে দিই। তোমরা বাঙ্গালা বাঙ্গালা বলিয়া সর্বত্র খুঁজিয়া বেড়াইতেছ; সংস্কৃত, ইংরেজী সমস্ত ওলট-পালট করিতেছ, কেবল একবার হৃদয়টার মধ্যে অনুসন্ধান করিয়া দেখ নাই … আমাদের ভাব আমাদের ভাষা আমরা যদি আয়ত্ত করিতে চাই, তবে বাঙ্গালী যেখানে হৃদয়ের কথা বলিয়াছে, সেইখানেই সন্ধান করিতে হয়।”

বাউল গানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই মমত্ববোধের সৃষ্টি তাঁর প্রতিভার একেবারে উন্মেষলগ্নে এবং এ সময় তিনি তাঁর চিন্তায় স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছিলেন। বাউল গানের প্রতি তার এই প্রীতিময়তার কথা উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ বলেন : “আমার লেখা যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন, বাউল পদাবলীর প্রতি অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদা দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলেচনা হত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউল সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল

কাথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষ
তার উদ্দেশ্যে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।। কথা নিতান্ত সহজ, কিন্তু সুরের যোগে এর অর্থ জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এই কথাটি উপনিষদের ভাষায় শোনা গিয়েছে: ‘এতং বেদ্যৎ পুরুষং বেদ মা বো মৃত্যু: যাঁকে জানবার সেই পুরুষকেই জানো, নইলে যে মরণ বেদনা। অপÐিতের মুখে এই কথাটি শুনলাম; তাঁর গেঁয়ো সুরে, সহজ ভাষায় যাকে সকলের চেয়ে জানবার তাকেই সকলের চেয়ে না জানবার বেদনা অন্ধকারে যাকে দেখতে পাচ্ছে না যে শিশু, তারই কান্নার সুর তার কণ্ঠে বেজে উঠছে। ‘অন্তরতর যদয়মাত্মা’ উপনিষদের এই বাণী এদের মুখে যখন মনের মানুষ বলে শুনলাম, আমার মনে বড় বিস্ময় লেগেছিল। এর অনেককাল পরে ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের অমূল্য সঞ্চয় থেকে এমন বাউলের গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত¡ তেমনি কাব্যরচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে। লোকসাহিত্যে এমন অপ‚র্বতা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করিনে। … আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন, তারা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্থ মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল স¤প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভাসমিতি প্রতিষ্ঠা হয়নি; এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিতি মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষা ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরাণ-পুরাণে ঝগড়া বাধেনি। … বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা সকলের অগোচরে আপনা-আপনি কি রকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।”

রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই আলোচনায় বাউল গানের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথাই শুধু বলেননি এ গানের বাণী ও সুরে যে আবহমানকাল ধরে হিন্দু-মুসলমান সকলকেই যে আনন্দ দিয়ে এসেছে এবং মিলনের সেুতবন্ধনের কাজ করে এসেছে সে কথাটিও অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ অপর এক স্থানে বলেন :

“… বাউলের গান শিলাইদহে খাঁটি বাউলের মুখে শুনেছি ও তাদের খাতা দেখেছি। নিঃসংশয়ে জানি বাউল গানে একটি অকৃত্রিম বিশিষ্টতা আছে, যা চিরকেলে আধুনিক। হাল আমলে কলেজে পাস করা ছেলে সেটা জাল করতে পারে না, সে তাদের মতার অতীত। ইংরেজী পড়া বাউলের গান আছে, দেখেছি তা অস্পৃশ্য। আমার অনেক গান বাউল ধাচের, কিন্তু জাল করতে চেষ্টা করিনি, সেগুলো স্পষ্টতঃ রবীন্দ্রবাউলের রচনা। কিন্তু কাব্যপরিচয়ে’ যে বাউল গানগুলো আছে সে আমার মাথায় আসত না, লোক ঠকাতে গেলে নিশ্চিত ধরা পড়তুম।”

১৯৩১ সালে লন্ডনে প্রদত্ত হিবার্ট লেকচারে রবীন্দ্রনাথ বাউলদের সম্বন্ধে বলেন :

“These people roam about singing their songs, one of which I heard zears ago from mz roadside window, the first two lines remaining inscribed in mz memorz :

Nobodz can tell me whence the bird unknown

Comes into the cage and goes out F

I would feign put round its feet

The fetter of mz mind –

Could I but capture it.

 

This village poet evidentlz agrees with sage of Upanishad who sazs that our mind comes back baffled in its attempt to reach the unknown being; and zet this poet like the ancient sage does not give up adventure of the infinite, thus implzing there is a waz to its realization. … It reminds me of Shellez’s poem in which he sings of the mzstical beautP :

 

The awful shadow of some unknown power

Floats, though unseen, among us visiting

This various world with its inconstant wing

As summer winds that creep flower to flower

Like moonbeams that behind some pinz mountain shower.

It visits with inconstant glance

Each human heart and countenance.

 

That this unknown is the profoundest realitz though difficult of comprehension, is equallz admitted bz the English poet as bz the nameless village singer of Bengal, in whose music vibrate the wing beats of the unknown bird… Onlz Shellez’s utterance is for the cultured few, while the Baul song is for the tillers of the soil, for the simple folk of our village households who are never bored bz the mzstic transcendentalism.”

রবীন্দ্রনাথ বলেন :
“…. সেই অজানা দুরধিগম্য হইলেও যে সকল সত্যের মূল সত্য তাহা এই বিখ্যাত ইংরেজ কবি এবং এই অজ্ঞাতনামা বাঙ্গালী উভয়েই বুঝিয়াছেন। সেইজন্য তাহার গ্রামসঙ্গীত সেই অজানা পাখীর ডানার সহিত মুখরিত। শুধু প্রভেদ এই যে, শেলীর ভাষা জনকয়েক শিক্ষিত লোকের জন্য, আর এই বাউল গান গ্রামের চাষী ও সর্বসাধারণের, যাহারা এই গানের অতিবাস্তবতায় অতিষ্ঠ হইয়া উঠে না।”

এই যে আমাদের বাউল গান একদিন হাজার নারী-পুরুষের মনকে মুগ্ধ এবং বিমোহিত করেছিল আজ পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতির প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা ঘটা করে নাগরিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা পরিবেশন করতে গিয়ে সুরকে যেমন পাল্টিয়ে ফেলছি তেমনি আধুনিক যন্ত্রপাতির সহযোগিতায় নগর-বাউলদের মাধ্যমে তা উপস্থাপন করতে গিয়ে মূল গানকে জগাখিচুড়ি এবং কি করে ফেলছি। এতে আধুনিক মন তৃপ্ত হলেও মূল সুরের অপমৃত্যুতে আমরা এ গানের সাধকদের মনোকষ্টের কারণ হয়ে পড়েছি।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় বুঝতে পেরেছিলেন, বাউলের গান তাঁর এই মাটি-মানুষের সুর নিয়ে বেঁচে থাকবে না; তাই ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীর মাধ্যমে এসব গান সংগ্রহে উৎসাহিত হন।

বাউল গান নিয়ে ইতোপূর্বেই আলোচনা করেছি। যা বলা হয়নি তা হল, আজ গোটা বাংলাদেশের সর্বত্রই বাউল ও বাউল গানের অস্তিত্বের কথা শোনা যায়। মুর্শিদী, মারফতী, হাসন রাজার গান, রাধারমণের গান সব গানই বাউল গান হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সুরের কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। সাজপােশাকে বাউল হলেই হল। বাউল গান এবং লালনের গান উভয়ই এখন দেশ ও দেশের বাইরে অত্যন্ত জনপ্রিয় গান হিসেবে চিহ্নিত। এ নিয়ে গবেষকদের য়োটাছুটিরও অন্ত নেই। ইউনেস্কো কর্তৃক বাউল গান ‘ওয়ার্লড হেরিটেজ’ হওয়ার পর দেশী-বিদেশী সকলেই মাঠে নেমে পড়েছেন। তাঁরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন। কেউ কেউ বাউলদেরকে ‘হিপ্পি’দের সাথেও মিলিয়ে দেখতে চাইছেন। ইতোমধ্যে সুফীসাধনা ‘পৃথিবীর সাধনা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ সুফী মতাদর্শে দীক্ষিত হচ্ছে। সুফীদর্শন এখন। মানবদর্শন। সুফী ধর্মানুগ বাউল গানেরও এই একই অবস্থা। মানবধর্ম হিসেবে বাউল সাধনা আজ সার্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে; তা পাক, তাতে ক্ষতি নেই। ক্ষতি সেখানে, যখন দেখি, বাউলগানের সুরে কোন বাছবিচার নেই। দেহ নাচিয়ে সুরে চমক দিতে পারলেই হল। এখনকার বাউল গানে ভাটিয়ালী, মাইজভাÐারী, কীর্তন, রাগ-রাগিনী, কখনো। জারিগান, সব বুঝি একাকার। সিলেটে বাউলগানের এক ঢঙ, ময়মনসিংহে আরেক। বরিশাল অঞ্চলেও বাউল এবং বিচ্ছেদের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। পশ্চিম বাংলায় (ভারত) অবশ্য বাউল গান এখনো প‚র্ণদাস বাউলের নিয়ন্ত্রণে। তিনি এবং তাঁর ভাই ল²ণদাস যে ধরনের বাউল গান গেয়ে চলেছেন তার সাথে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া। অঞ্চলের বাউল গানের মিল নেই। প‚র্ণদাস অসাধারণ শিল্পী; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত। তবে বীরভ‚মের বাউল শিল্পীদের গানের সঙ্গে তার পার্থক্য রয়েছে। প‚র্ণদাস নিজেই এখন একটি প্রতিষ্ঠান। স¤প্রতি একটি গবেষণা কাজে শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন সময়ে ‘জয়দেব’-এর বাউল মেলায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমার সাথে সেসময় দু’জন বাংলাদেশী গবেষক ছিলেন। দুজনেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলে মঞ্চের কাছাকাছি হতে কোন এক বাউল গানের শিল্পীর নাম ভেসে এল। তিনি গাইলেন হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ’। এরপরেও যাদের গান শুনলাম তারা প্রায় সকলেই একই পদের। আমরা তিনজনেই হতাশ হয়ে ফিরে এলাম। কিন্তু আমরা তাজ্জব বনে গেলাম লোকসমাগম দেখে। অবশ্য বর্তমানে লালন ফকিরের ঘেঁউড়িয়া আখড়ার পাশে বাউল গানের ষ্টেজ ঘিরেও সেই একই রকমের ভিড় দেখা যায়। দেশী-বিদেশী সকলেই ক্যামেরা, টেপ রেকর্ডার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বাউল নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বিদেশীরা পিছিয়ে নেই। ইতোমধ্যে Charles Capwell, ‘The Music of the Bands of Bengal’  নিয়ে কাজ করে পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেছেন। তাঁর কাজটি ভালো হয়েছে। তাঁকে আমি জানি। তিনি পশ্চিম বাংলার বাউলদের নিয়ে কাজ করেছেন, বাংলাদেশে আসেননি। এখানকার বাউলদেরকে নিয়ে কোন কাজও তার নেই। তাঁর বইটির রিভিউ’টি Journal of the Asian Folklore Studies-এ ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের বাউলদেরকে নিয়ে তিনি কোন আলোচনা করেননি; সে কারণে তাঁর কাজটি প‚র্ণাঙ্গ হয়নি বলে আমার মনে হয়েছে। বলেছি, পশ্চিম বাংলার বাউলদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাউলদের নানা পার্থক্য রয়েছে। জুনি ম্যাকড্যানিয়েলের লেখা ‘The Madness of the Saints’ বইটি সম্বন্ধে আমি রিভিউ’ করেছিলাম। এঁরা সকলেই পশ্চিম বাংলাভিত্তিক কাজ করেছেন। বাংলাদেশের বাউলদের সম্পর্কে বই পড়ে যা জেনেছেন তার কিছুটা জুনি’র গ্রন্থে রয়েছে। এ বইটিও প‚র্ণাঙ্গ হয়নি বলে আমার মনে হয়েছে। সর্বত্রই একটি প‚র্বধারণা কাজ করেছে। Edward C. Dimock অসাধারণ একজন পÐিত ব্যক্তি। তিনি বাউলদেরকে নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করেছেন। তাঁর এ বিষয়ে কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর ‘The Hidden Moon’  একটি অসাধারণ গ্রন্থ। তাঁর গ্রন্থটি এদেশে থেকে প্রকাশিত নানা গ্রন্থের তথ্যভিত্তিক। এ বিষয়ে তিনি কোন ক্ষেত্রে গবেষণা করেননি। বাউলদের সম্পর্কে তাঁর চমৎকার বিশ্লেষণ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ও বাউল বিষয়েও তার একটি বড় প্রবন্ধ আছে। উরসড়পশ তার গ্রন্থে পশ্চিম বাংলার বাউলদের বিষয়টি নিয়ে এসেছেন। বাউল সুফীদর্শন সম্পর্কেও তিনি মতামত দিয়েছেন। ঈধৎড়ষ ঝড়ষড়সড়হ বাউল বিষয়ে গবেষণার জন্য বাংলাদেশে আসেন এবং পরপর তিন বছরে তিনবার আমার বাসস্থানে থাকেন এবং আমার সঙ্গে বাউলদের বেশ কয়েকটি আখড়াবাড়িতে যান। আমার সঙ্গে দেখা হবার আগে তিনি শান্তিনিকেতনে সংস্কৃত ভাষার উপর গবেষণা করছিলেন। এসময় তিনি সনাতন দাসের উপর একটি লেখা আমার কাছে পাঠান। সনাতন দাসকে তিনি বাউল বলে চিহ্নিত করেছিলেন। আমি আপত্তি জানাই এবং তিনি তা গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি কুষ্টিয়াতে আমার বাড়ীতে চলে আসেন। আমি তাঁকে বাউলদের পরিভাষা এবং গানের অর্থ বুঝিয়ে দেই। এরপর তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন; কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কয়েক বছর আগে তিনি শেষবারের মতো কুষ্টিয়ায় এলে তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সাথে এরপর আর দেখা হয়নি। পরে জানতে পারি, তিনি
এবং লালনের গানের সুর সংরক্ষণের জন্য স¤প্রতি ইউনেস্কো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য; তবে কতদ‚র সফল হবে তা দেখার বিষয়। বাউল এবং লালনের গান আদি সুরে গাইবার জন্য প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যেখানে নিয়মিত আদি বাউলদের দ্বারা নতুন প্রজন্মদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে। তবে তার আগেই আদি সুর সংরক্ষণের জন্য আর্কাইভস্ নির্মাণ করতে হবে এবং ষ্টাফ নোটেশনের মাধ্যমে এই সুর সংরক্ষণ করতে হবে। তবে একাজে সর্বপ্রথমে যা দরকার তা হল কে বাউল এবং কে বাউল গানের যথার্থ শিল্পী তা নির্ণয় করা। বাংলাদেশের সাধকদের সকলেই বাউল নন। ভাওয়াইয়া যেমন রংপুর অঞ্চলের গান, বাউল তেমনি কুষ্টিয়া অঞ্চলের গান। এ গানের প্রবক্তা এবং শিল্পী ছিলেন লালন ফকির। তার একান্ত অনুসারী ভক্তরা গুরু পরম্পরায় এ গান এখনো তাদের কণ্ঠে ধারণ করে আছে। এমন হতে পারে যে, লালন ফকির কিংবা অন্যান্য বাউল গুরুদের শিষ্যগণ নানা অঞ্চল থেকে এসেছিলেন কিংবা লালন ফকির ও অন্যান্য বাউল গুরু বাংলাদেশের নানা স্থান পরিভ্রমণ করেছেন এবং সেই সুবাদে বিভিন্ন অঞ্চলে এ গানের প্রচার প্রসার ঘটেছে। তাই এ গানের পুরানো শিল্পী যারা ছিলেন তাঁদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের লাইব্রেরীতে শতশত বাউল এবং লালনের গানের রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। একজন যথার্থ নিষ্ঠাবান এবং নিবেদিতপ্রাণ বাউল সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ এ কাজে ব্রতী হবেন আমি এমন আশা রাখি।
আধুনিক বাংলাদেশ আজ পাশ্চাত্যকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে। পাশ্চাত্য আজ সবকিছুতেই বাজার অর্থনীতির ((Market Policz)) মানদÐে বিচার করছে। ফলে সংস্কৃতি আজ পণ্য হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। আমাদের দেশের । লোকসংস্কৃতি এমনিভাবে একটি বাজারজাত পণ্যবিশেষ। বলতে কি, নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে নগরজীবনে আমাদের লোকসঙ্গীত পাশ্চাত্য ঢঙে পরিবেশিত হচ্ছে এবং নগরবাসী তা খুশীমনে গ্রহণও করছে। বাউল এবং লালনের গান পপ সঙ্গীতের সুরে এবং ঢঙে গীত হচ্ছে। তরুণেরা উৎসাহের সঙ্গে তা রপ্ত করেও নিচ্ছে দ্রæততার সাথে। একদিন গ্রামেগঞ্জে যে বাউলের গান তিনদিন তিনরাত নিরবিচ্ছিন্নভাবে হাজার হাজার মানুষকে আনন্দ দিয়ে এসেছে, আজ তা সম্পূর্ণরুপে হারিয়ে যাচ্ছে। বাউল ও লালনের গান আজ সর্বাধিক জনপ্রিয়। এর অন্যতম কারণ এ গানে আধুনিক সুর ও তাল সংযুক্ত হয়েছেছ। ফরিদা পারভীন লালনের গানকে আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। কিন্তু তিনি অস্বীকার করতে পারবেন না যে, লালনের গানকে তিনি আধুনিক করেছেন তাঁর নিজস্ব ঢঙ এবং সুরের বৈচিত্রে। আজ যারাই লালন ও বাউলের গান গাইছেন তারা সবাই ফরিদাকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছেন।
প্রশ্ন উঠবে, লোকসঙ্গীত তো পরিবর্তনশীল; যুগে যুগে তার পরিবর্তন হয়েছে। কথাটি নিঃসন্দেহে ঠিক। কিন্তু এই পরিবর্তন লোকসঙ্গীতের পরিমÐলে হলে আপত্তির কিছু থাকে না। গায়কীতে যেটুকু পরিবর্তন দেখা যায় তার ভিত্তি তো গ্রামীণ জীবন। এক অঞ্চলের গান যখন অন্য অঞ্চলে গীত হয় তখন সুর, শব্দ বা বাণীতেও পরিবর্তন আসে। কিন্তু নাগরিক পরিমÐলে নানা আধুনিক যন্ত্রসঙ্গীতের সহযোগিতায় যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে তা কোনমতেই গ্রহণ করা যায়। আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, ইতোপূর্বে খোদ পাশ্চাত্যেই লোকসংস্কৃতির এমন অবস্থা হয়েছিল। গ্রেট বৃটেনে এখন আর লোকসঙ্গীত বলতে কিছুই নেই। লোকসঙ্গীত বলতে যা প্রচলিত তা আধুনিক সঙ্গীত। গবেষকদের বর্ণনামতে, “The English folk song legacz was probablz affected bz urban melodies as well as words. The clue here is that folk music in remote rural areas of the English-speaking world, such as Highland Scotland or the Appalachian mountains, abounds in tunes that emploz the pentatonic scale, a scale widelz used for folk music around the world. However, folk music was rare among the rural English villagers who first volunteered their tunes to researchers in the late 19th centurz. A plausible explanation is that life in rural England was far more closelz affected bz the proximitz to the urban cultures. Music in the standard major and minor scales evidentlz penetrated to the neaRby rural areas, where it was converted to folk idiom, but nevertheless succeeded in displacing the old pentatonic music.” প্রসঙ্গত: এই গবেষকগণ লোকসঙ্গীতের পুরোনো সুর, ছন্দ ও ভাষার ঐশ্বর্য ধ্বংসের মূলে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক পদ্ধতিকেই দায়ী করেন : “The pattern of urban literature in folk music who intensified to outright destruction, as soon as the capitalist economic szstem had developed to the point that culture could be widelz bought and sold.”

পাশ্চাত্য দেশে রাণী ভিক্টোরিয়ার আমলে সর্বপ্রথম সে দেশের লোকসঙ্গীত এমনিভাবে পণ্য হিসেবে বিক্রীত হয়েছিল। শিল্প বিপ্লবের ফলে এই পরিবর্তন আরো দ্রæতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে, কৃষিসমাজ ভেঙ্গে পড়ে এবং সংস্কৃতি পণ্য হিসেবে বাজারজাত হতে থাকে। এসব গ্রামোফোন লং পে, সিডি ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়। রেডিও, টেলিভিশনেও লোকসঙ্গীত শিল্প হিসেবে গণ্য হতে থাকে :”The marketplace kept expanding and it generated an industrz dedicated to the tradition of a musical product a bz paid elite of performers.”
গ্রামে-গঞ্জে এসব শিল্পীদের কদর কমে যাওয়ায় অনেক পুরোনো শিল্পী তাদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। কথা হচ্ছিল জারি গান, ফকিরী ও পদ্মাপুরাণ ইত্যাদি গানের অত্যন্ত পুরানো বয়াতী কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর নিবাসী মঈনউদ্দিন বয়াতীর সাথে। মঈনউদ্দিন তিনপুরুষ ধরে বয়াতী। বড় ভাই আবু তালেব ডোবা দীর্ঘদিন বয়াতী হিসেবে গান করেছেন। তাঁর পিতা তছের বয়াতী ছিলেন অত্যন্ত নামী শিল্পী। প্রকৃত অর্থে পিতার সঙ্গে শিল্পী হিসেবে গান গেয়ে তাঁরা দু’ভাই প্রচুর সুনাম অর্জন করেছেন। গ্রামবাসীরা চাঁদা তুলে তিনদিন তিনরাত ধরে গান-বাজনার যেমন ব্যয়ভার নির্বাহ করেছে তেমনি শিল্পীদের বিদায়ের সময়েও হাতে তুলে দিয়েছে ভাল অংকের টাকা। অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিল্পীদেরকে বায়না টাকা অগ্রিম দিতে হত। তা-না হলে অন্যেরা বেশী টাকা দিয়ে তাঁদেরকে নিয়ে যেত। একবার বায়না হাতে পেলে শিল্পীরা তাদের চুক্তি ভঙ্গ করত না। কেউ বেশী টাকা দিতে চাইলেও তা তারা গ্রহণ করেনি; বলেছে, “জবান নষ্ট হবে”। গ্রামে কারো অসুখ-বিসুখ হয়েছে; সে মানৎ করেছে ফকিরী গানের। গ্রামে সাপের উপদ্রব হয়েছে; গ্রামবাসী মিলে পদ্মাপুরাণ, ভাসান গান কিংবা বেহুলা-লখিন্দরের পালাগান অথবা ফকিরী গান গেয়েছে। পুরানো আমলে গ্রামে জমিদার এবং বিত্তবানেরা বসবাস করেছে তারাই এসব গানের ব্যবস্থা করেছে। ফলে আবহমানকাল ধরে। এমনিভাবে লোকউৎসব হয়েছে এবং লোকসঙ্গীত শিল্পীরা নানা ধরনের লোকসঙ্গীত পরিবেশন করে গ্রামের মানুষের চিত্তবিনোদনে বিশেষ ভ‚মিকা রেখেছে। মঈনউদ্দিন বললেন, “আমি টাকা উপার্জনের জন্য গান গাইনি; আনন্দের জন্য শিল্পী হয়েছিলাম। গ্রামের মানুষ আমাদেরকে আদর করেছে; আমরা প্রাণভরে গান করেছি। কিন্তু এখন আর গ্রামের মানুষ আর ডাকে না। রেডিও, ক্যাসেট-মাইকের মাধ্যমে সব গান শোনা যায়। আর আর কেউ তেমন বায়না করে।” ফলে শিল্পীদের অবস্থাও ভাল না। কিন্তু সংসার তো আর মানে না। মঈনউদ্দিন বলেন, “গান গেয়েছি, টাকাপয়সা, খাওয়া-দাওয়া সব পেয়েছি। সংসার ঠিক থেকেছে। কিন্তু এখন আর তেমন হচ্ছে না ফলে পেশা বদলে কৃষিকাজ শুরু করেছি। কখনো নিজের য়োট জমিতে আবার কখনো অন্যের জমিতে কাজ করছি। ধান-পাটের সময় দল ধরে কখনো বারাশে’ ধুয়ো গান গাই তা কেবল নিজেদের তৃপ্তির জন্য। অনেকে আর এসব গান গাইতে চায় না, কারণ সংসারে বড় অভাব।” মঈনউদ্দিন গানের মাধ্যমে যে অর্থ-বিত্ত আয় করার কথা বললেন, তার পেছনে কোন বাণিজ্য ছিল না। গ্রামের মানুষ আবহমানকাল ধরে এমন বায়না’ দিয়ে এসেছে। মঈনউদ্দিন দুঃখ করে বললেন, “বড় লোকেরা এখন আর কেউ গ্রামে থাকে না। সন্ত্রাসের কারণে তারা তো গ্রাম ছেড়ে শহরে বসবাস করছে। সন্ত্রাসের কারণে গ্রামেও মানুষের সুখ নেই। গান আর আসবে কোথা থেকে।

কথা হল দুর্লভ ফকিরের সঙ্গে। একসময় লালনের গান গাইতেন। এখন বয়স হয়েছে। গান আর গাইতে পারেন না। বললেন, “ফকিরেরা এখন আর গান গাইতে পারছেন না। তাদের দিন ফুরিয়ে গেছে। নতুনেরা জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু তারা যে সুরে গান করছে তা আমরা যেভাবে গেয়ে থাকি তা নয়। যে যেমন পারছে গান করছে। এক তালেই সব গান গাচ্ছে সকলে। এদেরই কদর। আমরা ফুরিয়ে যাচ্ছি।”

জারিগান একসময় খুব জনপ্রিয় গান ছিল কুষ্টিয়াতে। ছাত্তার বয়াতী এবং তার সখীদের বেশ নামডাক ছিল। তছের বয়াতী, তালেব এবং মঈনউদ্দিন জারিগানের বড় শিল্পী ছিলেন। তাক্কল ফকির, খোরশেদ ফকির, লাইলী, ফকিরচাঁদজোমেলা, নিমাই শাহ, বেহাল শাহ, ঝডু শাহ, কানাই ক্ষ্যাপা, মহিম শাহ, বাদের শাহ, স্বরূপ শাহ, গোলাম ইয়াসিন, মহেন্দ্ৰ গোঁসাই, খোদাবক্স, করিম শাহ একসময় বাউল গান এবং লালনগীতির দামী শিল্পী ছিলেন। এদের অধিকাংশই মৃত। এদের সুর আজ আর নতুনদের কাছে পৌঁছুলো না। পুরানো বাউল ফকিরদের মধ্যে অনেকে যারা এখনো বেঁচে আছেন তাঁরা বয়সর ভারে প্রায় শক্তিহীন; কণ্ঠে আজ আর কোন গান নেই। লালন একাডেমীতে পুরানো শিল্পীদের তেমন কদর নেই। এসব শিল্পীদের গানের কোন রেকর্ডও নেই। নতুন প্রজন্ম তাহলে শিখবে কোথা থেকে এই গান।

সিনেমা বা চলচ্চিত্রে, টেলিভিশন-রেডিও এবং ক্যাসেটে বাউল গানের যে সুর বাজে তা আদৌ আদি সুরের নয়। কিন্তু এসব গানের কদরই এখন বেশী; বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। গানের সাথে লোকবাদ্যও আজ বাজারজাত হচ্ছে। সব মিলিয়ে
‘বাণিজ্য’ ভালই চলছে। লালন উৎসবে এলে সঙ্গীত ও লোকবাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণ ভালই দেখা যায়। এর সাথে জমে ওেঠ নানা দোকানপাট, আলোকসজ্জা, প্যাÐেল ইত্যাদি। গোটা কুষ্টিয়ায় বলা যেতে পারে, উৎসবে মাতোয়ারা। নগরবাসীরা চিত্তবিনোদনের একটি ভাল সুযোগ পায় এসময়ে। দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা আসেন, মন্ত্রী, সচিব সবাই অংশগ্রহণ করেন। ষ্টেজে গান হয়, ছবি তোলা হয়। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত হয় এ উৎসবের কথা দেশ-বিদেশে। কিন্তু যারা একদিন এসব গান নিজেদের কণ্ঠে ধারণ করে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সেসব লোকসঙ্গীত শিল্পীদের দেখা মেলে এখানে।
বস্তুত: সঙ্গীতের বাণিজ্যিকীকরণ আজ এতই শক্তিশালী যে, নগরজীবনে আধুনিক যন্ত্রসঙ্গীতের মাধ্যমে পরিবেশিত লোকসঙ্গীতগুলোকেই দেশের জনগণ গ্রহণ করে নিচ্ছে। এই নাগরিক বা Urban Influence লোকসঙ্গীতকে তার আদি সুরে ফিরে যাবার কোন পথ রাখেনি। বাংলাদেশের লোকজীবনও আজ নাগরিক জীবনবোধের সঙ্গে তাল মেলাতে চাইছে। ফলে বয়াতীর গানের প্রতি আজ তাদের ঝোক গেছে কমে। লোকসঙ্গীতের এই দ্রæত পরিবর্তনে বর্তমান প্রচার মাধ্যম অর্থাৎ টেলিভিশন, রেডিও, ক্যাসেট ইত্যাদির প্রভাব অনেকাংশেই দায়ী। এসব মিডিয়া সহযোগে যে লোকসঙ্গীত প্রচারিত হচ্ছে জনমনে তার প্রভাব স্থায়ী হয়ে পড়ছে। ফলে পুরানো সুরের লোকসঙ্গীত আর প্রশংসিত হচ্ছে না। এরমধ্যে শিল্প বিপ্লব এব কৃষি বিপ্লবের ফলে ‘গণসঙ্গীত’ নামে তথ্য বিভাগের মাধ্যমে যা পরিবেশিত হচ্ছে আমাদের প্রাচীন লোকসঙ্গীতকে ধ্বংসের জন্য তা জোর ভ‚মিকা রাখছে। পয়সার লোভে কিছু শিল্পী পরিবর্তিত সুরে গান গেয়ে চলেছে নির্দ্বিধায়। প্রসঙ্গতঃ উলেখ করা প্রয়োজন যে, গ্রামে-গঞ্জে নতুনেরা পুরানো শিল্পীদের নিকট থেকে তাদের গান আর শিখতে চাইছে না। এর ফলে পুরানো শিল্পীরা হারিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে লালন ফকিরের বাউল গান Heritage-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় লালন এবং বাউল গান সর্বাধিক বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছে। এসবের ফলে আদি বাউল এবং অন্যান্য সঙ্গীত হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে বসবাসকারীরা লোকসঙ্গীতশিল্পীদের জন্য পৃষ্ঠপােষকতা করার কেউ আজ নেই। অতীতে গ্রাম-গঞ্জে যেসব ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বসবাস করত আজ নানা কারণে গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় তারা শহরে বসবাস করছে এবং তাদের সঙ্গে গ্রামের সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। তথাপি আজও যারা গ্রামে বসবাস করছে তারা আনন্দ-আহ্লাদে লোকশিল্পীদেরকে লালন করে আসছে। অসুখ-বিসুখে ‘মান’ হিসেবে ফকিরী এবং বাউল গান, পদ্মাপুরাণ, ভাসান; বিয়ে-শাদীতে মেয়েলী গীত ইত্যাদি পরিবেশিত হচ্ছে। তবে গ্রামে বিদ্যুৎ আসার ফলে টেলিভিশন ও রেডিও ব্যবহারের কারণে এসব অনুষ্ঠান অনেকটাই কমে আসছে। কিন্তু এই পেশায় আজ আর সংসারের অভাব দ‚র হয় না বিধায় অনেকেই এ পেশা ত্যাগ করছে। ফলে অনেক লোকসঙ্গীত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

সুতরাং এই লোকসঙ্গীত ও লোকশিল্পীদেরকে রক্ষা করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে সরকার কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণের সময় এসেছে। ইউনেস্কো এবং দাতাগোষ্ঠী এক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে পারে।
তথ্য ঃ শাহ মুহম্মদ সগীর, ইউসুফ-জোলেখা (ড. মুহম্মদ এনামুল হক সম্পাদিত), ঢাকা, পৃ ২২৫-২৩৮।
দৌলত খান উজির বাহরাম খান, লাইলী-মজনু।

Dr. Mohd. Moin, A Persian Dictionary, Vol. V, Proper Names, Tehran, 1978, pp. 137.

Abdul Wali, On Curious Tenets and Pratices of Certain Class of Faqirs in Bengal, Journal of the Anthropological Societz of Bombaz, Vol. 5, 1900, p.17

Ibid.